নিবর্তনমূলক ৫৭ ধারার অবলুপ্তিসহ আটক দুই কিশোর ব্লগারের মুক্তি ও নিরাপত্তা চাই

বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনা ও ইতিহাসের সংরক্ষণে বাংলা ব্লগ ও বাঙালি ব্লগারদের যে ভূমিকা তার চূড়ান্ত প্রকাশ আমরা দেখেছিলাম শাহবাগ আন্দোলনের মাধ্যমে। এবং বাংলাদেশের অস্তিত্ববিরোধী শক্তির হাতিয়ার হিসেবে ধর্মের ব্যবহারটাও আমরা দেখতে পেরেছিলাম সেই একই সময়ে। দেখেছিলাম ধর্মকে ঢাল হিসাবে ব্যবহার করে নব রূপে জন্ম নিয়েছে রাজাকার বান্ধব হেফাজতী আন্দোলন। এরই প্রেক্ষিতে পহেলা এপ্রিল ২০১৩ তারিখে চারজন নাস্তিক ব্লগারকে ডিবি পুলিশ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬ এর ৫৭ (১) ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছিলো। যে ধারাটির সন্নিবেশন বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আইন, মহান সংবিধানের ধর্ম-নিরপেক্ষতার মূলনীতি এবং বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার চূড়ান্ত অবমাননা। [১] এরপরে জল গড়িয়েছে অনেকটাই, অসাংবিধানিক এই ধারাটি তার বিষবৃক্ষের ডালপালা ছড়িয়েছে আরো বহুদূর।

এই কালো আইনের সর্বশেষ শিকার চট্টগ্রাম নিবাসী দুই কিশোর ব্লগার কাজী রায়হান রাহী ও উল্লাস ডি ভাবন। গত ৩০ মার্চ’ ২০১৪ তারিখে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে নিজেদের আসন্ন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রবেশপত্র সংগ্রহ করতে গেলে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি তাদের উপর আক্রমণ চালায় জামাত-শিবির মনষ্ক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা। [২] পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা সংগ্রহ করে- অপর এক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসি এবং একাধিক হত্যার হুমকি ও জঙ্গিতৎপরতায় উষ্কানিদাতা ফারাবি শফিউর রহমান’এর সাথে, প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসে দ্বিমত পোষণকারী রাহি ও উল্লাসের কিছু কথপোকথন। [৩] “অপরাজেয় সঙ্ঘ” নামক এই জামাতমনষ্ক সন্ত্রাসি দলটির সাথে ফারাবি’র যোগাযোগের প্রমাণও স্পষ্ট। এরই প্রেক্ষিতে, আক্রান্ত ব্লগারদের উপরে হামলা করবার পূর্বে তারা তৈরি করে ধর্মীয় উষ্কানিমূলক প্রচারপত্র এবং সময় বুঝে ঝাপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র দুই কিশোরের ওপর। গুরূতরভাবে আক্রান্ত কিশোরদ্বয়কে স্থানীয় পুলিশ সুরক্ষা প্রদানের পরিবর্তে ৫৭ ধারায় গ্রেফতার করে তথতাকথিত ধর্মানুভূতিতে আঘাত দেবার অজুহাতে।

উল্লেখ্য যে, অভিযুক্ত ব্লগার দুজনই অপ্রাপ্ত বয়স্ক কিশোর এবং এই বারের অনুষ্ঠিতব্য এইচ,এস,সি, পরীক্ষার্থী। তা হওয়া স্বত্বেও তাদের সাথে পুলিসের আচরণ মোটেও কিশোর অপরাধীর মত ছিল না। এমনকি অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক হওয়া সত্তেও এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার কারণবশতও, ৫৭ ধারার অবাস্তব মারপ্যাঁচে পড়ে তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হয়ে যায়। সেই সাথে, নিরাপত্তাজনিত কারণে এই কিশোরদ্বয়ের পক্ষে স্থানীয় আইনজীবিরাও দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে। উল্লাস, ইসলাম ভিন্ন অন্য ধর্মাবলম্বী বলে অনেক আইনজীবিই তার পক্ষে মামলা লড়তে অস্বীকৃতি জানান বলেও জানা গেছে। তাছাড়া এদের পরিবারও স্পষ্ট নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। এই পুরো ব্যাপারটাই দেশের মধ্যে একটি নষ্ট, জঙ্গিবান্ধব ও ধর্মান্ধ পরিবেশ তৈরি হবার প্রমাণ বহন করে।

তবে এরথেকেও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে- এই ঘটনার পরেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রাহি ও উল্লাসের উপর চলা জীবন সংশয় সৃষ্টিকারী এই হামলার হোতা “অপরাজেয় সঙ্ঘ” নামক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী সঙ্গঠনটির একাধিক সদস্যের দাম্ভিক স্বীকারোক্তি থাকা সত্তেও তাদের বিরূদ্ধে কোনো প্রকার আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এমনকি তারা প্রকাশ্যে এই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির হুমকি প্রদান করা সত্তেও তারা নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে। [৩] অথচ এগুলোর সবই বাংলাদেশের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে স্পষ্ট দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এদের বিরূদ্ধে কোনোপ্রকার ব্যবস্থা গ্রহন করা তো হয়ইনি, বরং এদের নির্বিঘ্ন চলাফেরার সুযোগ দিয়ে প্রশাসন এই ব্লগারদের পরিবারকেও হুমকির মুখে ফেলছে।

উল্লেখ্য যে, তথ্য ও প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি প্রথম থেকেই মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের কারণে বিতর্কিত। সেই সাথে স্বাধীন, ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশে বার বার ব্লাসফেমী আইনের বিকল্প হিসেবে এর ব্যবহার যথেষ্টই আশংকার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি, দেশের প্রচলিত অন্যান্য আইনের সাথেও এই ধারাটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কেউ চুরি করুক, ডাকাতি করুক, খুন করুক, ধর্ষন করুক- তার জামিন আছে। কিন্তু, ৫৭ ধারার অপরাধের কোন জামিনের সুযোগ রাখা হয়নি। সেই সাথে এই ধারায় কৃত অপরাধ-এর ন্যুণতম শাস্তি ৭ বছরের কারা দন্ড, যেখানে ধর্ষনের মত জঘন্যতম একটি অপরাধের ন্যুনতম শাস্তিও এরচেয়ে কম। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে ফেইসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে ধর্মীয় মৌলবাদি ও রাজাকারদের সংগঠন জামাতে ইসলামীর কর্মীরা বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধাপরাধীদের রায়ের আগে ও পরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের উস্কানি, পরিকল্পনা কোন রকম বাধা ছাড়াই করেছে। এর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কোনপ্রকার আইনের আওতায় নেয়া না হলেও সামান্য ফেইসবুক স্ট্যাটাস যেগুলোতে কারো কোন শারীরিক ক্ষতি বা এমন কিছুর দুরতম সম্ভাবনাও নেই সেখানে ধর্মীয় অবমাননার অজুহাতে ব্লগ ও অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারিরা গ্রেফতার ও হেনস্থার স্বীকার হচ্ছে।

বিসিবিএ বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের মহান সংবিধান কোনো ব্যক্তিবিশেষকে যেমনটি নির্দিষ্ট ধর্মবিশ্বাস লালল করায় বাঁধা দেয় না, তেমনি কারো ধর্মের প্রতি অবিশ্বাসেরও পালন, প্রচার এবং প্রকাশকে রূদ্ধ করে না। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে বিসিবিএ ঘৃণাভরে বলতে বাধ্য হচ্ছে, স্পষ্টতঃই সরকারের মধ্যে হেফাজতী, ধর্মান্ধ একটি অংশ প্রবল ভাবে প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছে। এবং এদেরই প্রত্যক্ষ উষ্কানীতে জাতির সংবিধানের রক্ষক হয়েও তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার মতো সংবিধানের প্রতি চরম অবমাননামূলক একটি আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। এবং ক্রমাগত অপব্যবহারের মাধ্যমে এই আইনটিকেই ব্লাসফেমি আইনের আদলে গড়ে তুলে বাংলাদেশের পাকিস্তান যাত্রা নিশ্চিত করছে তারা।

বাংলা কমিউনিটি ব্লগ এলায়েন্স (BCBA) এর পক্ষ থেকে অন্যন্য সমমনা গ্রুপ এবং ব্যক্তিবর্গের সাথে সমন্বয়ে আক্রান্ত দুই ব্লগারকে সর্বোচ্চ আইনী সহায়তা দেবার লক্ষে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে এই মুহুর্তে। যে ঘৃণ্য ৫৭ ধারার অজুহাতে বারবার মুক্তমতকে দলিত করা হচ্ছে তার বিরুদ্ধেও সর্বাত্মক প্রতিরোধ এবং জনসংযোগ সৃষ্টি করতে আমরা সচেষ্ট। এই প্রেক্ষিতেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নিম্নলিখিত দাবীসমূহ উপস্থাপন করা হচ্ছে-

ক) আটককৃতদের অবিলম্বে মুক্তি দিয়ে তাদের শিক্ষাজীবনের সুস্থ প্রবাহ ও পারিবারিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
খ) আক্রমণকারী সন্ত্রাসিদের উষ্কানিদাতা, সঙ্গঠকসহ জড়িত প্রত্যেকের বিরুদ্ধে প্রশাসনের যথাযথ ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
গ) সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মচারী এবং কর্মকর্তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
ঘ) আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা বাতিল/সংশোধন করে মুক্তমতের প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে
ঙ) ভবিষ্যতে এ ধরণের ঘটনা প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকরি ব্যবস্থাগ্রহণ করতে হবে।

এছাড়াও আটককৃত ব্লগারদের মুক্তি ও নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে বিসিবিএ সচেষ্ট থাকবে এবং আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা রদকল্পে ক্রমাগত কর্মসূচি প্রদান করে যাবে বলে আমরা শতভাগ নিশ্চয়তা দিচ্ছি।

তথ্যসূত্রঃ

[১] http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_all_sections.php?id=957

[২] http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article767003.bdnews

[৩] http://i.imgur.com/FzsngVU.jpg

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: